সত্তরের দশকে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির আবিষ্কার উন্নত -উন্নয়নশীল দেশগুলোর রান্নায় এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কম সময়ে রান্নার কাজ সম্পন্ন করতে এই ইলেকট্রোনিক যন্ত্রটির রয়েছে জুড়ি মেলা ভার। অন্যদিকে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ঘটে যেতে পারে যে কোনো ধরনের বড় দূর্ঘটনা।
তাই, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে রান্না কিংবা খাবার গরম করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আপনাকে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে। আবার, নিরাপত্তা ও নির্ভরতার জন্যে কিছু বিষয় বর্জণ করতে হবে।
কারণ, মাইক্রোওয়েব ওভেনের কিছু সুবিধা-অসুবিধা আছে যেগুলো আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি। এবার চলুন তবে, জেনে আসা যাক কি কি কাজ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে করবেন এবং কি কি কাজ করবেন না-
যে ১০টি কাজ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে করবেন
১. রান্না শুরুর আগে অবশ্যই মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যবহারবিধি পড়ে দেখুন-
মাইক্রোওয়েভের সাথে একটা ছোট ব্যবহারবিধি, নিয়মকানুন নিয়ে বই দেয়া থাকে। কি ধরনের দ্রব্য রান্না করা যাবে, কোন পাত্রে রান্না করতে হবে এ ধরনের কিছু সতর্কতা সূচক দিক নির্দেশনা থাকে। অবশ্যই তা পড়ে দেখে নিন।
২. কাঁচ, সিরামিকের তৈরি পাত্র কন্টেইনার হিসেবে ব্যবহার করুন
কাঁচ, সিরামিক মাইক্রোওভেনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। এক্ষেত্রে বিস্ফোরণের কোনো ঝুঁকি নেই। তাই, এগুলো ব্যবহার করুন।
৩. প্লাস্টিক ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করে দেখুন
অনেকেই মাইক্রোওয়েভ ওভেনে প্লাস্টিক দিতে ভয় পান। ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। প্লাস্টিক মাইক্রোওভেনে ব্যবহার যোগ্য, যদি তা উন্নতমানের হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আপনাকে প্লাস্টিকটি পরীক্ষা করে নিতে হবে।
পরীক্ষা করার জন্য সুইচ অন করে ওভেনে রেখে ১ মিনিট অপেক্ষা করুন। যদি গলে না যায়, তাহলে নিশ্চিত থাকুন প্লাস্টিকটি আপনার জন্য নিরাপদ।
৪. নির্দিষ্ট সময় পর পর পাত্রে ঝাঁকুনি দিন
মাইক্রোওয়েভে রান্নায় একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর পাত্র ঝাঁকান। এতে তাপ খাদ্যের সবখানে ছড়িয়ে যাবে এবং অল্প সময়ে রান্না শেষ হবে। এ ছাড়াও খাবার নির্দিষ্ট সময় পর পর ঝাঁকানোর ফলে তাপের সঞ্চালনে খাদ্যস্থিত ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত ধ্বংস হয়।
৫. বুদবুদ না উঠা পর্যন্ত সেদ্ধ করুন
খাবার অন্তত ৭৫° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রান্না করুন এবং বুদবুদ না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সাধারণত তরল জাতীয় খাদ্যে বুদবুদ হয়ে থাকে। শক্ত খাবারের ক্ষেত্রে বাষ্পায়িত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। খাদ্যে বুদবুদ আসতে বা বাষ্পায়িত হতে ২-৩ মিনিট সময় লাগে। এতে খাদ্যে থাকা জার্মস নষ্ট হয়ে সুরক্ষিত খাদ্য পেতে পারেন।
৬. থার্মোমিটার ব্যবহার করা
ব্যাকটেরিয়াপ্রবণ খাদ্যগুলো গরম করার ক্ষেত্রে থার্মোমিটার ব্যবহার করে তাপমাত্রা চেক করে নিন। আর ১৬৫° ফারেনহাইট না হওয়া পর্যন্ত মাইক্রোওয়েভে রাখুন।
৭. খাবার ঢেকে গরম করুন
খাদ্যের মধ্যে বিভিন্ন মিনারেলস থাকে যা তাপের সংস্পর্শে গলে যায়। তাই, খাদ্য অবশ্যই ঢেকে, বক্সে নিয়ে গরম করুন।
৮. মাইক্রোওয়েভ ওভেন পরিষ্কার রাখবেন
ডিটারজেন্ট, পরিষ্কার কাপড়, গরম পানি দিয়ে সব সময় মাইক্রোওয়েভ ওভেন পরিষ্কার করবেন। অপরিষ্কার কাপড় দিয়ে মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার করবেন না। এতে ময়লা থেকেই যাবে। হাতের কাছে ভালো ডিটারজেন্ট না থাকলে বেকিং সোডা এবং ভিনেগার মিক্স করে পরিষ্কার করতে পারেন।
এছাড়া পুনরায় ব্যবহার যোগ্য হিসেবে পেপার টাওয়াল এবং একবার ব্যবহার যোগ্য হিসেবে টি-টাওয়াল দিয়েও মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার রাখতে পারেন। সপ্তাহে অন্তত ১ বার মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার করুন।
৯. ভিটামিন ‘বি’ এবং ‘সি’ সমৃদ্ধ সবজিগুলো ধোঁয়া না উঠা পর্যন্ত রান্না করুন
ভিটামিন বি এবং সি সমৃদ্ধ সবজি ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই, খাবার সমূহ ধোঁয়া না উঠা পর্যন্ত রান্না করুন।
১০. রান্নার পর বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিন
প্রত্যেকবার রান্না শেষ হওয়ার পর কিংবা রান্না করা খাবার গরম করার পর মাইক্রোওয়েভের ইলেকট্রিক সংযোগ বন্ধ করে দিন। এতে অনাকাংখিত দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
যে ৯টি কাজ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে করবেন না
১. ধাতব পদার্থের ব্যবহার
মাইক্রোওয়েভে ধাতব পদার্থের ব্যবহার অবশ্যই বর্জনীয়। তাপের সংস্পর্শে আসলে অনেক ধাতুই গলে যায়, যার ফলে মাইক্রোওয়েভে যে-কোনো ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই, মাইক্রোওয়েভে ধাতুর তৈরী জিনিসপত্র ব্যবহার করা উচিত নয়।
স্টেইনলেস স্টিল, ট্রাভেল মগ, এলুমিনিয়াম ফয়েল পেপার এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
২. অনিরাপদ প্লাস্টিক ব্যবহার করবেন না
অনেক ক্ষেত্রেই আমরা খাবার মোড়কের যে প্লাস্টিক থাকে, সেটিসহ মাইক্রোওয়েভে দিয়ে থাকি। এটা কখনোই করবেন না। তাপ প্লাস্টিকের দহন ঘটায়, ফলে যে-কোন ধরনের বড় দূর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন।
এছাড়া মাইক্রোওয়েভে গরম করা প্লাস্টিকের কন্টেইনারের খাবার মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. একই সময়ে ভিন্ন ধরনের খাবার একসাথে দিবেন না
ভিন্ন ভিন্ন খাবারের গলনাংক বিভিন্ন হয়ে থাকে। আবার, তাপ ধারণ ক্ষমতাও ভিন্ন। যেমন আলু এবং স্যুপের মধ্যে স্যুপ আগে সেদ্ধ হয়, আলু পরে। কিন্তু আলুর তাপ ধারণ ক্ষমতা স্যুপের তুলনায় বেশি। এতে আলু আর স্যুপ একসাথে দিলে বের করার সময় কোনোটাই পার্ফেক্ট হবে না।
মনে রাখবেন, অতিমাত্রায় রান্না যেমন খাদ্যের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে, তেমনই কম রান্না খাবার ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ হয়ে থাকে।
৪. মাংস সেদ্ধ করবেন না
স্যুপ তৈরির জন্য অনেকেই মাংস মাইক্রোওয়েভে সেদ্ধ করে থাকেন। এক্ষেত্রে, ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করার ঝুঁকি থাকে এবং মাংসের অনেক জায়গায় শক্ত থেকে যায়। তাই, মাইক্রোওয়েভে মাংস সেদ্ধ না করাই উচিত।
তবে জরুরি প্রয়োজনে মাংস সেদ্ধ করতে হলে এর আগের দিন থেকে স্টিক-কিমা করে ফ্রিজের বটমে রেখে দিতে পারেন। এরপর মাইক্রোওয়েভে দিন।
৫. তাজা সবজি, ফলমূল মাইক্রোওয়েভে দিবেন না
তাজা সবজি ফলমূলের মাইক্রোওয়েভ তাপ সহ্য ক্ষমতা কম। অনেক তাজা সবজি মাইক্রোওয়েভে দেয়ার পর ছড়িয়ে যায় এবং নোংরা করে ফেলে। এতে খাবারে পুষ্টিমান ও নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে, পানিতে দ্রবণীয় সবজি, ফলমূল যেমন- লেবু, পেয়ারা,কমলা, পালংশাক, সরিষা স্ট্রবেরির ক্ষেত্রে এগুলো বেশি ঘটে।
৬. মাইক্রোওয়েভে ডিম সেদ্ধ করবেন না
মাইক্রোওয়েভে ডিম সেদ্ধ করবেন না। মাইক্রোওয়েভের হিটে ডিমের খোসা ফেটে ছড়িয়ে যায়। যদি বাড়তি কাজ করার ইচ্ছে না থাকে, তাহলে ডিম সেদ্ধ করা বাদ দিন।
৭. মাইক্রোওয়েভে শুধু মরিচ গরম করবেন না
মরিচ তাপের সংস্পর্শে আগুন জ্বালায়। এছাড়া মরিচ ফেটে আপনার চোখে-মুখে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই, বিপদ এড়াতে মরিচ গরম করবেন না।
৮. মায়ের দুধ কিংবা বাচ্চাদের যে-কোন দুধ গরম করবেন না
মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বাচ্চাদের দুধ গরম করলে এতে বোতলের তাপমাত্রা বোতলের মধ্যকার দুধের তাপমাত্রা একই হয় না। ফলে অ্যামিনো এসিড বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকে পরিণত হয়।
৯. ফাস্টফুডের ক্ষেত্রে র্যাপিং পেপারসহ গরম করবেন না
বিভিন্ন ফাস্টফুডে যে এলুমিনিয়াম ফয়েল পেপার দেয়, তা তাপে গলে যায়। তাই, র্যাপিং পেপার খুলে তা গরম করবেন। খাদ্যের নিজস্ব কন্টেইনারে গরম করলে পুষ্টিমান অক্ষুণ্ণ থাকে।
অতিরিক্তি পরামর্শ: মাইক্রোওয়েভ ওভেনের দরজা না লাগলে, বেঁকে গেলে কিংবা ভেঙে গেলে এ বিষয়ে দক্ষ কারো সাহায্য নিন।
শেষ কথা: আপনার কিছু সাবধানতাই দিতে পারে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে কম সময়ে জীবাণুমুক্ত সুরক্ষিত খাবার।
Leave a Reply